মিলছে টিকা, করোনায় স্বস্তি – Bhorer Kagoj


উপহার, কেনা কিংবা কোভ্যাক্সের আওতায় দেশে প্রায়ই আসছে করোনা প্রতিরোধী টিকার বড় চালান। ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তির টিকা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল তারও সমাধান হয়েছে। সিরামের উৎপাদিত অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দিয়ে দেশে টিকা কার্যক্রম শুরু হলেও একে একে এই টিকা কার্যক্রমের যুক্ত হয়েছে ফাইজার, মডার্না ও সিনোফার্মের টিকাও। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ৭ কোটি ২২ লাখ টিকা পাওয়া গেছে। মার্চের মধ্যে ১২ কোটি মানুষকে দুই ডোজ টিকা দেয়ার পরিকল্পনা সরকারের। তাহলে ৭০ শতাংশের বেশি মানুষকে টিকা দেয়া হয়ে যাবে।

চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী টিকা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। আর গণটিকা কার্যক্রম শুরু হয় ৭ ফেব্রুয়ারি। ৩ এপ্রিল ১০ জনকে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেয়া হলেও ৮ এপ্রিল সারা দেশে করোনা টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেয়া শুরু হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোভিড-১৯ টিকাদান সংক্রান্ত দৈনিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন ৩ কোটি ৬৫ লাখ ৯৯ হাজার ১৪০ জন। আর দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ১ কোটি ৮১ লাখ ৩০ হাজার ৩২১ জন। এদিকে প্রাণঘাতী করোনার প্রলয়ঙ্করী রূপও এখন আর নেই। দেশে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিও একটি স্বস্তিদায়ক অবস্থায় আছে। রাজধানীসহ সারাদেশের করোনা বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে কমেছে করোনা রোগীর চাপ। ওঠানামা করলেও মৃতের সংখ্যাও ধীরে ধীরে কমছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচেই রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী টানা তিন থেকে চার সপ্তাহ করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে ধরে নেয়া হয়।

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা, টিকাদান কর্মসূচি এবং সামাজিক গতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসের শেষদিকে জাপানের শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিক নিক্কি এশিয়া বৈশ্বিক করোনা সূচক প্রকাশ করে আসছে। জাপানের নিক্কি কোভিড-১৯ রিকভারি ওই সূচকের

তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে করোনা ভাইরাসের ধাক্কা সামাল দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। বিশ্বের ১২১টি দেশ ও অঞ্চলের করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর চারটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে এই সূচকটি তৈরি করা হয়। আগের বারের তুলনায় এবার বাংলাদেশের ৪৮ ধাপ উন্নতি হয়েছে। ১২১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমানে ২৬তম স্থানে রয়েছে।

টিকা প্রাপ্তির পথ প্রশস্ত হওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে আমাদের দেশে টিকা আসছে। টিকাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতা ছিল তা কেটে গেছে। বিষয়টি অবশ্যই ইতিবাচক। সরকার যে চেষ্টা করেছে তা সফল হয়েছে। তবে টিকা নিয়ে খুব একটা উৎসাহিত হওয়ার সুযোগও নাই। কারণ, টিকা নিয়েছেন এমন ১০০ জনের মধ্যে ৬০ জনই করোনায় সংক্রমিত হচ্ছেন। তবে মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে টিকার ভূমিকা রয়েছে। শনাক্ত ব্যক্তির জটিলতাও কমবে। তবে মাস্ক না পরলে, স্বাস্থ্যবিধি না মানলে বিপদ থেকেই যাবে।

করোনা সংক্রমণ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট এই ভাইরোলজিস্ট বলেন, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে করোনা সংক্রমণে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই ধারা মার্চ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত থাকবে। গত বছরও আমরা এই চিত্র দেখেছি। সংক্রমণ কেন কমছে এই বিষয়ে কোনো গবেষণা নেই। তবে এ নিয়ে আমরা একটি কাজ করছি। এখন শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা উদ্বেগের।

চিকিৎসাবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্সেসের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী ভোরের কাগজকে বলেন, বর্তমানে করোনা রোগী কম শনাক্তের ক্ষেত্রে কতগুলো কারণ আছে। করোনা প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রম চলছে। বিজ্ঞান বলে সামাজিক সংক্রমণ যদি দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত থাকে তাহলে প্রাকৃতিকভাবে প্রতিরক্ষা তৈরি হয়। যশোরে সংক্রমণ কমার ক্ষেত্রে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সেখানে এমনটা হয়েছে।

সংক্রমণ ও শনাক্ত রোগী কমতির ধারা দেখে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো কারণ নেই বলে মনে করেন বিশিষ্ট এই চিকিৎসাবিজ্ঞানী। তার মতে, সংক্রমণের নিম্নগামীধারা অব্যাহত রাখতে টিকাদান কার্যক্রমের যেমন বিকল্প নেই, তেমনি স্বাস্থ্যবিধি মানারও বিকল্প নেই।

সংক্রমণের কমতির ধারা স্বস্তিদায়ক অবস্থায় আছে- এমনটা বললে মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, সংক্রমণ এখন সর্বনিম্ন অবস্থায় আছে। তবে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি আছেই। আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানছি না। মাস্ক পরছি না। এর মধ্যে শ্বাসতন্ত্র সংক্রমণজনিত রোগ বাড়ছে। প্রতি মুহূর্তে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

এসআর



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *