বাংলাদেশ-ভারত দ্বৈরথের আগেই বাকযুদ্ধের দামামা


সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ভারত কাগজে-কলমে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়েও দুদলের সে পার্থক্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। বাংলাদেশ যেখানে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের ১৮৯তম স্থানে সেখানে ৮২ ধাপ এগিয়ে ভারতের অবস্থান ১০৭তম। র‌্যাঙ্কিং পার্থক্য যাই হোক, বাংলাদেশের ছেলেরাও ছেড়ে কথা বলার পাত্র নয়। এবার জামালরা ঢাকা ছাড়ার আগে জানিয়েছেন তাদের লক্ষ্য সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল খেলা। ফলে মানসিক আত্মবিশ্বাসে টইটুম্বুর জামালরা প্রতি ম্যাচে জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবেন।

অন্যদিকে ভারতের অধিনায়ক সুনীল ছেত্রীও বলেছেন বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচটিকে তারা যুদ্ধ হিসেবে দেখছেন। এর আগে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। ফলে প্রথম জয়ের আত্মবিশ্বাস সঙ্গে নিয়েই সোমবার (৪ অক্টোবর) ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। ম্যাচটি বাংলাদেশ সময় বিকাল ৫টায় মালদ্বীপ জাতীয় ফুটবল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ এক আকর্ষণীয় লড়াই। সেই ১৯৯৫ সাল থেকে দক্ষিণ এশীয় ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের এ লড়াইয়ে দুদলের খেলা ছড়িয়েছে আকর্ষণ। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে এখনো পর্যন্ত ৯ বার মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত। ৪টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। ভারতের ৪ জয়ের বিপরীতে বাংলাদেশের জয় হয়েছে মাত্র একটি। যে কোনো টুর্নামেন্টে ভারতরে বিপক্ষে এটিই বাংলাদেশের সর্বশেষ জয়। সে জয় এসেছে ১৮ বছর আগে, ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে ভারতকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর জয়ের কাছাকাছি গেলেও জয়ের স্বাদ আর ভারতের বিপক্ষে পাওয়া হয়নি বাংলাদেশের।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয় দিয়ে সাফ শুরু করা বাংলাদেশ এখন রণপ্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত বধের জন্য। র‌্যাঙ্কিং আর পারফরম্যান্স সব কিছুতে অনেক এগিয়ে ভারত। ফিফার শীর্ষ র‌্যাঙ্কিং তালিকায় বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে ৮২ ধাপ পিছিয়ে থাকলেও দেশটির বিপক্ষে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বলছে ছেড়ে কথা বলবেন না জামাল-তপুরাও। সর্বশেষ মুখোমুখি পাঁচ ম্যাচের মধ্যে ৩টিতে ড্র আর ২টিতে হার বাংলাদেশের। গত ৭ জুন বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ২-০ গোলে হারের আগে টানা তিন ম্যাচ ভারতকে রুখে দিয়েছিল তারা। এখন পর্যন্ত দুদল মুখোমুখি হয়েছে ৩০ বার। জয়ের পাল্লা ভারতেরই ভারি। তাদের ১৬টি জয়ের বিপরীতে বাংলাদেশের জয় মাত্র ২টি। আর বাকি ১২ ম্যাচ ড্র।

পূর্বের পরিসংখ্যান যাই হোক না কেন বাংলাদেশ সাফে ভালো কিছু করার জন্য মরিয়া। নিয়মিত কোচকে ছুটি দিয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে অস্কার ব্রুজোনকে। তার অধীনে জয় দিয়ে শুরু করেছে বাংলাদেশ, এবার পালা ভারত বধের। তাই প্রথম ম্যাচে জয়ের পরও রয়ে-সয়ে সময় কাটায়নি বাংলাদেশ। মাঠে কঠোর অনুশীলনের মধ্যে ঘাম ঝরাচ্ছেন লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। সুখবর হলো জ্বরে আক্রান্ত সোহেল রানা ও রেজাউল করিম সুস্থ হয়েছেন। ইতোমধ্যেই মাঠে ফিরে অনুশীলনও করেছেন মাঝমাঠের অভিজ্ঞ খেলোয়াড় সোহেল, যা ব্রুজোনকে আরো স্বস্তি দেবে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয় পেলেও ফিনিশিংয়ে সমস্যা দেখা গেছে প্রকটভাবে। ভারতের বিপক্ষে জয় পেতে হলে সুযোগ মিস করা যাবে না। না হয় হারের বেদনা নিয়েই ছাড়তে হতে হবে মাঠ।

এদিকে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের পেনাল্টিকে ‘ফানি’ হিসেবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় মন্তব্য করেছিলেন ভারতের ক্রোয়েশিয়ান কোচ ইগর স্টিমাচ। ভারতের কোচের সংবাদ সম্মেলনের আগে বাংলাদেশ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেয়। সেই সম্মেলনে এসেছিলেন অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ভারতের কোচের পেনাল্টি নিয়ে এমন মন্তব্য নিয়ে অধিনায়ককে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘এটা তার মতামত। আমাদের মানসিক চাপে রাখার জন্য বলতে পারেন।’

ম্যাচের আগের দিন স্টিমাচ বলেছেন, ‘আমরা এমন স্টাইলে খেলব, যা আমাদের ফল এনে দেয়। নেপাল একটি কাউন্টার অ্যাটাক করেছে, তাতেই জয় পেয়ে গেছে। যদিও মালদ্বীপ ছিল ভালো দল। অন্যদিকে হাস্যকর পেনাল্টিতে জিতেছে বাংলাদেশ।’ তিনি আরো যোগ করেন, ‘আমরা জানি না, প্রতিটি ম্যাচে কী হবে। আমাদের সামনে যাই আসবে, তার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করব। আমরা ভালো করছি। এমন কন্ডিশনে টুর্নামেন্টে অংশ নিতে পেরে আমরা খুশি।’

এদিকে নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে সুনীল বলেছেন, ‘আমার কাছে প্রত্যেকটি ম্যাচই যুদ্ধের মতো। তাই শেষে মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে যেতে হবে। ৯০ নয়, আমাদের ১০০ শতাংশ উজাড় করে দিতে হবে। কোনো ম্যাচই সহজ নয়।’ প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ হওয়ায় এ নিয়ে ভীষণ সতর্ক সুনীল। তার মতে, ‘বাংলাদেশ সম্প্রতি কোচ পরিবর্তন করেছে। প্রতিপক্ষ হিসেবে ওরা খুবই শক্তিশালী। গত তিন-চার মাসে আমরা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলেছি। কঠিন লড়াই হয়েছিল। সব দলই উন্নতি করেছে। আমরা ম্যাচ ধরে ধরে এগুতে চাই। এখন শুধু বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবছি।’

তবে সেই আতঙ্ক দূর করে বাংলাদেশ দলের অনুশীলনে তপু বলেন, ‘অবশ্যই ছেত্রীকে আটকানোর সব চেষ্টা আমাদের থাকবে। আমি নিজেও একটু বেশিই সতর্ক থাকব।’ প্রথম ম্যাচ জয়ে উজ্জীবিত জামাল ভূঁইয়ারা ভারতকে হারানোর কথাই বলছেন। অবশ্য ড্রতেও খুশি থাকবেন তারা। ভারতের কাছ থেকে ১ পয়েন্ট পেলে টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠার পথে ভালোভাবে টিকে থাকবে বাংলার ছেলেরা। হারলে পিছিয়ে পড়তে হবে। গত ৪টি সাফে গ্রুপপর্বই পেরুতে না পারার ব্যর্থতা ভোলেনি বাংলাদেশ। তাই এবার অন্তত ফাইনাল খেলার আশা। মিডফিল্ডার সোহেল রানা জ্বর কাটিয়ে অনুশীলনে ফিরেছেন। ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামতে তৈরি বলেই জানালেন।

ভারতকে হারানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমি এখন ভালো অনুভব করছি। কোচ একাদশে রাখলে সেরটা দিতে চাইব। ভারতের বিপক্ষে জিতলে সেটা হবে আমাদের জন্য দারুণ কিছু। আশা করি, আমরা জিততে পারব ওদের বিপক্ষে।’ কোচ ব্রুজোন একদিক থেকে এগিয়ে রাখছেন বাংলাদেশকে। বলছেন, ‘ভারতের পয়েন্ট শূন্য, বাংলাদেশের ৩। এই জায়গায় মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমরা এগিয়ে থাকব।’ ৩ পয়েন্ট হাতে নিয়ে মাঠে নামা মনোবল বাড়াবে নিশ্চয়ই। তবে কোচ জানেন, ভালো রক্ষণ করতে না পারলে বিপদ আছে ভারত ম্যাচে।

এর আগে নিজেদের প্রথম ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে ১-০ গোল ব্যবধানে হারিয়ে বাংলাদেশ সাফের পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে অবস্থান করছেন। আর মালদ্বীপকে হারিয়ে টেবিলের দুইয়ে অবস্থান নেপালের। ভারতের পর বাংলাদেশের পরবর্তী ম্যাচ স্বাগতিক মালদ্বীপের বিপক্ষে আগামী ৭ অক্টোবর। আর নিজেদের শেষ ম্যাচে জামালরা নেপালের মুখোমুখি হবে আগামী ১৩ অক্টোবর।

রি-কেই/ইভূ



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *