টিকায় উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা!


টিকা ছাড়া চলাচলে শাস্তির সিদ্ধান্তে হতবাক-হতাশ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা

করোনা মহামারির মতো একটি জটিল পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যবিদদের মতামতকে এড়িয়ে আমলানির্ভর পরিকল্পনার মাধ্যমে মোকাবিলার চেষ্টা করেছে সরকার। এর পরিণতিতে দেশে করোনা সংক্রমণের দেড় বছর ধরে এই ভাইরাসের পেছন পেছনই চলতে হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবারও করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার তেমনি আরেকটি উচ্চাভিলাষী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। করোনা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের বৈঠকে সংক্রমণ রোধে ১০ আগস্ট পর্যন্ত বিধিনিষেধ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া ১১ আগস্ট থেকে মানুষের চলাচলের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। টিকা ছাড়া আর কেউ কর্মস্থলে যেতে পারবেন না। বাইরে বের হলে শাস্তির মুখে পড়তে হবে। ওই বৈঠক শেষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, ১১ আগস্টের পর টিকা ছাড়া কেউ চলাফেরা করলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। অবশ্যই টিকা নিতে হবে। আইন না করলেও অধ্যাদেশ জারি করে হলেও শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হবে। এই সিদ্ধান্তটি ‘অবৈজ্ঞানিক’ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এমন পদক্ষেপ সরকারের বিচক্ষণতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

টিকা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনায় হতবাক বিশেষজ্ঞরা। এ নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে তারা বলেন, যত বেশি মানুষকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে; করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণে তা তত বেশি ভূমিকা রাখবে। তাই বলে টিকা নেয়ার ক্ষেত্রে সরকার কাউকে জোর করতে পারে না। নানা জটিলতার কারণে অনেকেই টিকা নাও নিতে পারেন। তাছাড়া দেশে সাধারণ শ্রমিক থেকে শুরু করে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা কয়েক কোটি। বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, এত লোককে দেয়ার মতো টিকা কি আমাদের দেশে মজুত আছে? ওই কয়েক দিনের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষকে টিকা দেয়া কি আদৌ সম্ভব? তাহলে এমন অবাস্তব ও অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত কিসের ভিত্তিতে নিয়েছে সরকার? তাদের মতে, এমন অতি উচ্চাভিলাষী সিদ্ধান্ত না নিয়ে করোনার টিকা নিশ্চিতে মানুষের মধ্যে আগ্রহ ও সচেতনতা বাড়াতে

পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। অনেকের মধ্যে টিকা বিষয়ে অনীহা যেমন রয়েছে, তেমনি আছে বিভ্রান্তিও। এসব দূর করতে জনসচেতনতা কার্যক্রম প্রয়োজন। শুধু বাংলাদেশ নয়; অনেক দেশেই টিকা কার্যক্রমের শুরুতে জনগণের মধ্যে সন্দেহ দেখা দেয়। ব্রিটেনের মতো দেশেও টিকাবিরোধী বিশাল সমাবেশ হয়েছে। পরে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হলে সে দেশে টিকা কার্যক্রম সফল হয়। আমাদের দেশেও টিকা নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি। পাশাপাশি মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে টিকা না দিলে কী কী সমস্যা হতে পারে, তাও বোঝানো যেতে পারে।

এদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া টিকা না নিলে বেতন বন্ধের পাশাপাশি অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সোমবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিনের দেয়া ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের যেসব কর্মকর্তা ও কর্মচারী এখনো করোনা প্রতিরোধী টিকা নেননি তাদের নিবন্ধন সম্পন্ন করে আগামী ১৬ আগস্টের মধ্যে টিকা নেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হলো। অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী টিকা গ্রহণ সম্পর্কিত টিকা কার্ড/টিকা সনদ আগামী ২২ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে প্রশাসনিক শাখায় জমা প্রদান করবেন। ওই সময়ের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যতীত টিকা গ্রহণ না করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা/কর্মচারীর বিরুদ্ধে বেতনসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

সরকারের এমন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে মেডিকেল অ্যানথ্রোপলজিস্ট ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের রাজশাহী জেলার সভাপতি ডা. চিন্ময় দাস ভোরের কাগজকে বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত অবৈজ্ঞানিক। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সব কর্মজীবী মানুষকে টিকার আওতায় আনা অসম্ভব। তাছাড়া টিকা না নিলে শাস্তির বিধান কোনো আইনে নাই। এই জনস্বাস্থ্যবিদ বলেন, করোনা নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মুখ্য ভ‚মিকা পালনের কথা। কিন্তু তাদেরই এক কোনে বসে থাকতে হচ্ছে। মুখ্য ভূমিকা পালন করছে প্রশাসন। প্রশাসন দিয়ে জনস্বাস্থ্য রক্ষার কাজ করানো হচ্ছে। তাই সেই সিদ্ধান্তগুলো কোনো সুফল বয়ে আনছে না। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির এক সদস্য ভোরের কাগজকে বলেন, প্রশাসনের মধ্যে একটি মহল আছে, যারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায়। মূলত তারাই এমন উদ্ভট সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। টিকা না নিলে যদি ১১ আগস্ট থেকে বাইরে বের না হওয়া যায়, কাজে না যাওয়া যায় তাহলে সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষ বিপদে পড়বে। তখন জাল সনদ বেচাকেনার একটা চক্র গড়ে উঠতে পারে। এত মানুষকে এই কম সময়ে টিকা দেয়ার সক্ষমতাও সরকারের আছে কিনা- সেটিও বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানানো উচিত। তবে সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী বলেছেন, এখন ওয়েবসাইটে টিকার তথ্য আছে, কেউ মিথ্যা তথ্য দিতে পারবে না।

এদিকে দেশে মহামারির ভয়াবহ সংক্রমণ কমিয়ে আনতে সরকার সারাদেশে ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে এক সপ্তাহে এক কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে। এই পরিকল্পনার অধীনে ১৫ হাজার ২৮৭টি ওয়ার্ডে ৬৯ হাজার ৩১৮ সেশনে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৪২ হাজার টিকাদানের সিদ্ধান্ত হয়। বর্তমানে সক্ষমতা আছে ৩ লাখ ডোজের; কিন্তু দেয়া হচ্ছে ৫০ হাজার। এ অবস্থায় এক সপ্তাহে ১ কোটি টিকা দেয়া কতটা সম্ভব, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সম্প্রতি টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০ জনের শরীরে করোনা টিকার ডোজ না দিয়ে কেবল সুঁই ঢুকিয়েই সিরিঞ্জ ফেলে দিয়েছেন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে এলে সেই সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক বলেন, হাসপাতালে অনেক মানুষজন টিকা নিতে আসায় সেখানে অনেক চাপ ছিল। অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটনাটি ঘটে গেছে। যদিও এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিন্তু তারপরও তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক রবিবার বলেন, ৭ থেকে ১৪ আগস্ট (৭ দিনে) উৎসবমুখর পরিবেশে দেশের মানুষকে অন্তত ১ কোটি টিকা দেয়া হবে। দেশের ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায় থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত সর্বত্র এই টিকা উৎসব চলবে। এই উৎসবে বয়স্ক মানুষকে অগ্রাধিকার দিয়ে তারপর অন্য ব্যক্তিদের টিকা দেয়া হবে। অধিকসংখ্যক মানুষকে টিকার আওতায় আনতে জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা বিশেষ ক্ষেত্রে আরো সহজ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।

The post টিকায় উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা! appeared first on Bhorer Kagoj.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *