দীর্ঘসূত্রিতায় নমুনা রিপোর্ট টিকার এসএমএস-নিবন্ধন


মা, দুই ভাইসহ নিজের জন্য করোনা ভাইরাস প্রতিরোধক টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন জয়ন্তি ভৌমিক। ১২ জুলাই টিকার জন্য নিবন্ধন করলেও কবে টিকা নিতে পারবেন এখনো পর্যন্ত এ সম্পর্কিত কোনো এসএমএস পাননি তারা। একই অবস্থা সাংবাদিক মরিয়ম সেজুঁতিরও। ঈদের আগে টিকার জন্য নিবন্ধন করলেও তিনিও এখনো পাননি কোনো এসএমএস।

সুজন দাসের (২৭) বিষয়টি ভিন্ন। টিকার নিবন্ধনের জন্য বয়সসীমা কমানোর পর তিনি সুরক্ষা অ্যাপসে গিয়ে নিবন্ধনের চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। কিন্তু কিছুতেই তা সম্পন্ন করতে পারছেন না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের কাপড়ের ব্যবসায়ী সুজন জানান, মোবাইল ফোনে তিনি বেশ কয়েকবার নিবন্ধন করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাতে সফল হননি। পরে বাজারের কম্পিউটারের দোকান থেকে চেষ্টা করেছেন। সেখানেও নিবন্ধন করতে পারেননি। দোকানদার জানিয়েছেন, সার্ভারে ঢোকা যাচ্ছে না। আবার ঢুকতে পারলেও সব তথ্য পূরণ করার পর সেটি ‘সেন্ড’ অপশনে চাপ দিলে তা কাজ করছে না।

ঢাকার বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা আশরাফ উদ্দিন (৫৫) গত ২৯ জুলাই করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়েছেন মুগদা হাসপাতালে। কিন্তু গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি সেই রিপোর্ট পাননি। বাসাবোর বাসিন্দা আশরাফ উদ্দিন বলেন, আমাদের ব্যাংকের কয়েকজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আমার মধ্যেও করোনার কিছু উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। তাই পরীক্ষা করানোর জন্য নমুনা দিয়েছিলাম। কিন্তু এখনো সেই রিপোর্ট পেলাম না। জয়ন্তি ভৌমিক, মরিয়ম সেজুঁতি কিংবা আশরাফ উদ্দিনের মতো এমন অভিজ্ঞতা এখন অনেকেরই। টিকা গ্রহণ এবং নমুনা পরীক্ষা নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতার কবলে পড়েছেন তারা।

করোনা ভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ায় দেশজুড়েই সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। মানুষের মধ্যে টিকা নেয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ বেড়েছে। তাছাড়া বয়সসীমা কমানোতে টিকা গ্রহীতার আওতাও বেড়েছে। প্রতিদিনই কয়েক হাজার মানুষ অনলাইনের টিকার জন্য নিবন্ধন করছেন। অনেকে সুরক্ষা অ্যাপসে টিকা নিবন্ধনের কাজটি সম্পন্ন করতে পারছে না। আবার টিকার নিবন্ধন করার পরও অনেকে পাচ্ছেন না টিকা নেয়ার জন্য এসএমএস।

অন্যদিকে, সংক্রমণ বাড়ায় বেড়েছে করোনার নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা। প্রতিদিনই নমুনা পরীক্ষা করাতে মানুষ ভিড় করছেন বিভিন্ন হাসপাতালে। পরীক্ষার জন্য নমুনা দিলেও কয়েক সপ্তাহ কেটে গেলেও মিলছে না রিপোর্টের ফলাফল। আর এসব ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে ত্রিমুখী দীর্ঘসূত্রিতা।

টিকার এসএমএস পেতে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে সম্প্রতি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক সাংবাদিকদের বলেন, সুরক্ষা প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধনের অংশটুকু আমাদের। তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বটাও আমাদের। তবে এসএমএসের দায়িত্ব সারাদেশের ৬৭৬টি টিকাকেন্দ্রের এবং কেন্দ্রে যারা চিকিৎসক রয়েছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যারা দায়িত্ব রয়েছেন, তাদের। তারা ঠিক করেন এই কেন্দ্রে কত হাজার নিবন্ধন করা হয়েছে এবং কাদের টিকা দেয়ার জন্য এসএমএস দেয়া হবে। সেই অনুযায়ী কেন্দ্র থেকে তালিকা ঠিক করে এসএমএস পাঠানো হয়।

অনলাইনে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সমস্যা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (গবেষণা ও উন্নয়ন) এবং টিকা বিতরণ কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. মিরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা ভোরের কাগজকে বলেন, টিকাগ্রহণের বয়স কমিয়ে আনার পর থেকেই ব্যাপক হারে টিকার নিবন্ধন হচ্ছে। অনলাইনে টিকার জন্য নিবন্ধনকারীর সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের দেশে ২৫ বা তদুর্ধ্ব বয়সিদের সংখ্যা অনেক। তাই অনেকেই যখন নিবন্ধনের জন্য চেষ্টা করেন তখন সার্ভারে কিছুটা সমস্যা হয়। গত দুই তিন দিন ধরে সার্ভারে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তাই অনেকে নিবন্ধন করতে পারছেন না।

নিবন্ধন করার পর এসএমএস না পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, মানুষ তার সুবিধা অনুযায়ী কয়েকটি নির্দিষ্ট হাসপাতালেকেই টিকা কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। ফলে ওই হাসপাতালগুলোতে নিবন্ধন বেশি হচ্ছে। আর কিছু হাসপাতাল কেন্দ্রে নিবন্ধন কম হচ্ছে। ফলে যেসব হাসপাতালে নিবন্ধন বেশি হচ্ছে সেখান থেকে এসএমএস পেতে দেরি হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই। যারা নিবন্ধন করেছেন তারা টিকা পাবেন।

এদিকে, নিবন্ধন করে করোনা পরীক্ষা করা এবং রিপোর্ট পেতে বেশ কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয়। ঢাকার বাইরে এই অপেক্ষার প্রহর আরো বেশি। জরুরি ভিত্তিতে করোনা পরীক্ষা করাতে গিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে অনেককে। কারণ নিবন্ধন ও মোবাইল ফোনে এসএমএস না থাকায় তাদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রিপোর্ট পেতেও সময় বেশি লাগছে।

করোনার নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, নমুনা পরীক্ষার ল্যাব বেড়েছে। সেই সঙ্গে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার সংখ্যা বেড়েছে। অনেক জায়গায় নমুনা জমেও যেতে পারে। তাছাড়া কারিগরিক কিছু সমস্যাও হতে পারে।

তবে জানা যায়, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট স্বল্পতা, পরীক্ষা রিপোর্ট তৈরিতে নানা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এছাড়া কিছু জেলায় আরটি পিসিআর মেশিন না থাকায় সেখানকার নমুনা পাঠাতে হয় পার্শ্ববর্তী ল্যাবে। যেখানে আরটি পিসিআর মেশিন রয়েছে। ওই সব জেলায় অ্যান্টিজেন পরীক্ষা চালু করা হলেও কারো নমুনা পজিটিভ হলে সে নমুনা আবার ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখান থেকে ফলাফল আসতে ৪/৫ দিন পার হয়ে যায়।

এসআর



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *