দেশে টিকা এসেছে দুই কোটি ৯ লাখ


# দেশে অনুমোদন সাতটিতে, প্রয়োগ ৪ টিকা # আগস্টের মধ্যে আসবে প্রায় এক কোটি ২৯ লাখ # প্রসূতি ও স্তনদানকারী নারীদের টিকার বিষয়ে এখনো সুরাহ হয়নি # দুই দফা কমানো হলো নিবন্ধনের বয়সসীমা

দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর এক বছরের মধ্যেই শুরু হয় এই ভাইরাস প্রতিরোধী টিকাদান কার্যক্রম। করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য এ পর্যন্ত সাতটি টিকার অনুমোদন দিয়েছে ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমোদকৃত টিকাগুলো হলো ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদিত অক্সফোর্ড- এ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড, রাশিয়ার স্প্রুটিনিক ভি, চীনের তৈরি সিনোফার্ম ও সিনোভ্যাক্স, যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার-বায়োএনটেক, মর্ডানা ও জনসন অ্যান্ড জনসন। তবে দেশে এ পর্যন্ত টিকা প্রয়োগ হয়েছে মাত্র চারটি কোম্পানির। সেগুলো হলো; কোভিশিল্ড, সিনোফার্ম, ফাইজার ও মর্ডানা।

কবে, কোন টিকা কী পরিমাণ এলো
২০২০ সালের ৫ নভেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউট এবং বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মধ্যে টিকা আমদানির বিষয়ে চুক্তি হয়। এরপর ২১ জানুয়ারি ভারত সরকারের উপহার হিসেবে দেশে আসে ২০ লাখ ডোজ টিকা। ২৫ জানুয়ারি কেনা টিকার প্রথম চালান আসে। ওই সময় ৫০ লাখ ডোজ টিকা আসে দেশে। কেনা টিকার দ্বিতীয় চালান আসে ২২ ফেব্রুয়ারি। প্রতি চালানে ৫০ লাখ ডোজ টিকা আসার কথা থাকলেও ওই দিন ২০ লাখ ডোজ টিকা আসে। ২৬ মার্চ ভারত সরকার আবারো ১২ লাখ ডোজ উপহার হিসেবে দেয় বাংলাদেশকে। সব মিলিয়ে ভারত থেকে মোট ১ কেটি ২ লাখ ডোজ টিকা দেশে এসেছে। এরপর কোভিশিল্ডের আর কোন টিকা দেশে আসেনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনস (গ্যাভি) এবং কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনসের গড়া প্ল্যাটফর্মের (কোভ্যাক্স) সুবিধার আওতায় ৩১ মে দেশে আসে ফাইজারের ১ লাখ ৬০০ ডোজ টিকা। চীন সরকার ১২ মে সিনোফার্মের ৫ লাখ ও ১৩ জুন ৬ লাখ ডোজ মোট ১১ লাখ ডোজ টিকা উপহার হিসেবে বাংলাদেশকে দেয়া। সরকারের চুক্তির আওতায় ১ ও ২ জুলাই চীন থেকে আসে ২০ লাখ ডোজ টিকা। আর ১৭ জুলাই আসে আরো ২০ লাখ ডোজ টিকা। এ পর্যন্ত সিনোফার্মের ৫১ লাখ ডোজ টিকা দেশে এসেছে। আর ১ ও ২ জুলাই মর্ডানার ২৫ লাখ ডোজ টিকা আসে দেশে। আর ১৯ জুলাই আরো ৩০ লাখ ডোজ মর্ডানার টিকা দেশে আসে কোভ্যাক্সের সুবিধার আওতায়। এ নিয়ে মর্ডানার ৫৫ লাখ ডোজ টিকা দেশে এসেছে।

কবে কোন টিকা অনুমোদন পেলো; কবে থেকে প্রয়োগ শুরু
দেশে প্রথম কোভিড প্রতিরোধে অনুমোদন পায় কোভিশিল্ডের টিকা। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি কোভিশিল্ড টিকার অনুমোদন দেয় ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। চলতি বছরের ২৭ তারিখ টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয় ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদিত অক্সফোর্ড-এ্যাস্ট্রেজেনেকার কোভিশিল্ড টিকা প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। তবে এই গণটিকা কার্যক্রম শুরু হয় ৭ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ভারতের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টিকা বাংলাদেশে না পাওয়ায় সংকট তৈরি হয়। বিকল্প উৎস থেকে চলে টিকা সংগ্রহের চেষ্টা। এরপর থেকে একে একে দেশে এসেছে চীনের তৈরি সিনোফার্ম, ফাইজার-বায়োএনটেক ও মর্ডানার টিকা।

২৯ এপ্রিল সিনোফার্মের টিকার অনুমোদ দেয় ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। ২০ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এই চার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের উপর টিকা প্রয়োগ করা হয়। আর সারাদেশে সিনোফার্ম টিকার প্রয়োগ শুরু হয় ১ জুলাই।

২৭ মে দেশে জরুরি প্রয়োগের অনুমতি পায় ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা। ২১ জুন ফাস্ট রান হিসেবে দেশের বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রলিভার ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল-এই তিন হাসপাতালে প্রয়োগ হয় এই টিকা। ১ জুলাই এই তিন হাসপাতালের সাথে যুক্ত হয় আরো চারটি হাসপাতাল। সেগুলো হলো; ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

ফাইজারের টিকা প্রসঙ্গে কোভিড-১৯ টিকা ব্যবস্থাপনার টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক (এমএনসি এন্ড এএইচ) ডা. মো. শামসুল হক জানান, ফাইজারের টিকার পরিবহন এবং সংরক্ষণ যেহেতু কিছুটা কঠিন তাই ঢাকা শহরের সাতটি কেন্দ্রে এই টিকা দেয়া হচ্ছে।

ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর জরুরি ব্যবহারে জন্য ২৯ জুন মডার্নার টিকার অনুমতি দেয়। দেশে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী গণ টিকাদান কার্যক্রমে মর্ডানার টিকা যুক্ত হয় ১৩ জুলাই। রাজধানীসহ সকল সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এই টিকা প্রয়োগ করা হচ্ছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকার ৪০টি সরকারি হাসপাতাল ও ঢাকার বাইরে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বিভিন্ন হাসপাতালে এ টিকা প্রয়োগ করা হচ্ছে।

এছাড়া ২৭ এপ্রিল স্পুৎনিক-ভি, ৩রা জুন সিনোভ্যাক, ১৫ জুন জনসন এন্ড জনসন জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমতি দেয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এসব টিকা এখনো দেশে আসেনি।

সংকট কাটছে
টিকার সংকট দেখা দেয়ায় ২৬ এপ্রিল থেকে প্রথম ডোজ দেয়া এবং ২ মে’র পর থেকে টিকার জন্য নিবন্ধন বন্ধ ঘোষণা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পরবর্তীতে সিনোফার্ম ফাইজার ও মর্ডানার টিকা প্রাপ্তির পর সেই প্রতিবন্ধকতা দূর হলে পুনরায় চালু হয় টিকার প্রথম ডোজ ও নিবন্ধন কার্যক্রম। ১৯ জুন সারাদেশে আবার শুরু হয় করোনা টিকার প্রথম ডোজ দেয়ার কার্যক্রম। আর দীর্ঘ বিরতির পর ৮ জুলাই থেকে আবারো টিকার জন্য নিবন্ধন কার্যক্রম উন্মুক্ত করা হয়।

১৯ জুলাই বিমানবন্দরে মর্ডানার টিকা গ্রহণের সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, আগামী মাসের শেষ নাগাদ প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ টিকা আসবে দেশে। এর মধ্যে ২৯ লাখ এ্যাস্ট্রাজেনেকা, ৪০ লাখ সিনোফার্ম ও ৬০ লাখ জনসন এন্ড জনসন।

টিকার সুবিধা বাড়াতে দুই দফা কমালো নিবন্ধনের বয়স
প্রধনমন্ত্রী এবং সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে দেশের সকল নাগরিককে ক্রমান্বয়ে টিকার আওতায় আনা হবে। সেই জন্য সরকার টিকা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। টিকার সুবিধা যাতে বেশি সংখ্যক মানুষ পায় সে জন্য দুই দফা কমানো হলো টিকার জন্য নিবন্ধনের বয়স সীমা। গত বছরের ২৬ জানুয়ারি টিকর জন নিবন্ধন শুরু হয্ শুরুতে ৪০ বছর উর্ধ্বের নাগরিকরা টিকার জন্য নিবন্ধন করতে পারবেন। চলতি বছরের ৫ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ৩৫ বছর বয়স হলেই টিকার জন্য নিবন্ধন করা যাবে। ১৯ জুলাই বয়স সীমা আরো কমানো হয়।

বয়সসীমা ৩০ এ নামিয়ে আনা হয়। সুরক্ষা অ্যাপসে টিকা নেয়ার বয়সসীমা ৩০ বছর করা হয়। তবে ১২ জুলাই রাতে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটি তাদের সর্বশেষ বৈঠকে টিকা নিতে নিবন্ধনের বয়স ১৮ বছরে নিয়ে আসার পরামর্শ দেন। এর পর ১৫ জুলাই এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও জানিয়েছেন তারা টিকা নিতে বয়স ১৮ বছর বিবেচনার চিন্তাভাবনা করছে। মন্ত্রী বলেন, দেশের শিক্ষা কার্যক্রমকে পুনরায় গতিশীল করতে ১৮ বছরের উর্ধ্বে সকল নাগরিককে ক্রমান্বয়ে কোভিড-১৯ টিকার আওতায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

আগে ১৮ ক্যাটাগরিতে টিকা দেয়া হতো। বয়স সীমা যখন ৩৫ বছর করা হলো তখন সেই অগ্ৰাধীকার তালিকায় যোগ করা হয় কৃষক ও শ্রমিক জনগোষ্ঠীকে।‌

সুরাহা হলো না প্রসূতিদের টিকা
দেশে প্রসূতি ও স্তনদানকারী নারীরা এখনো টিকার বাইরে রয়েছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে আগের চেয়ে বেশি প্রসূতি ও স্তনদানকারী নারী করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি এ কারণে গর্ভধারণকালে অনেকের মৃত্যুও হচ্ছে। তাই এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলসহ (সিডিসি, ইউএসএ) কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখন পরামর্শ দিচ্ছে যে, প্রসূতি ও স্তনদানকারী নারীরা করোনার টিকা নিতে পারবেন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্তনদানকারী নারীকে টিকা দেয়া হলে এ থেকে তৈরি হওয়া এন্টিবডি তার শরীর তেকে সন্তানের শরীরে পৌঁছায়। যা শিশুর শরীরে এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলে। তবে স্বল্প পরিসরের গবেষণায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যক্তিতে বাংলাদেশে এখনো প্রসূতি ও স্তনদানকারী মায়েদের টিকা দেয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে অবস্ট্রাক্টিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রওশন আর বেগম বলেন, যখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সিডিসি এ সংক্রান্ত অনুমোদন দেয় তখনই আমাদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

১৮ তারিখ করোনা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনলাইন বুলেটিনে এ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে অধিদপ্তরের পরিচালক ও মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, প্রসূতি ও স্তনদানকারী নারীদের উপর এখনো পর্যন্ত পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। তাই আমরা এ বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমতি পেলেই এ বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেবো।

কত টিকা দেওয়া হলো
দেশে এ পর্যন্ত ৭১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৩৪ জন প্রথম ডোজ পেয়েছেন। আর দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ৪৩ লাখ ১ হাজার ৪০৫ জন। এর মধ্যে কোভিশিল্ডের টিকা দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ৮ হাজার ১১৯ ডোজ।‌‌ এর মধ্যে প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে ৫৮ লাখ ২০ হাজার ৩৩ টি। আর দ্বিতীয় ডোজ দেয়া হয়েছে ৪২ লাখ ৯৮ হাজার ৮৬ জনকে।‌ ফাইজারের টিকা দেয়া হয়েছে ৫০ হাজার ১০৪ ডোজ। সিনোফার্মের ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬৬০ জন প্রথম ডোজ আর ৩ হাজার ৩১৯ জন দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন। মডার্নার ২ লাখ ৬৯ হাজার ৫৩৭ প্রথম ডোজ টিকা শেষ।

এসআর/আরবি



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *