ফের ভয়ংকর রূপে করোনা – Bhorer Kagoj


সীমান্ত ছেড়ে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে সারাদেশে

* সংক্রমণ বেশি খুলনা-রংপুরে, কম সিলেটে
* যে কোনো সময় ঢাকায় আসবে বড় আঘাত

আবারো ভয়ংকর হয়ে উঠছে করোনা পরিস্থিতি। আগে রাজধানীসহ ঢাকা বিভাগের পার্শ্ববর্তী এলাকায় করোনার সংক্রমণ বেশি থাকলেও ক্রমশই তা ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। মে মাসের পর এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে। সংক্রমণ বেড়ে গিয়ে ওই সব এলাকার পরিস্থিতি ক্রমশই জটিল হয়ে পড়েছে। ফলে দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে কঠোর বিধিনিষেধের মেয়াদ। সংক্রমণ বেশি হওয়া এলাকায় সরকার আগেই স্থানীয়ভাবে লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কিছুতেই যেন বাগে আসছে না পরিস্থিতি। আসন্ন কুরবানির ঈদের আগে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে ঈদের পর করোনা পরিস্থিতির আরো অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকায় যে কোনো সময় প্রচণ্ড আঘাত হানতে পারে করোনা।

পরিস্থিতি যে ভয়াবহ হবে তেমন আশঙ্কার কথা আগেই জানিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে করোনা নিয়ে আশঙ্কার বার্তায় সংস্থার প্রধান তেদ্রোস আধানম গ্যাব্রিয়েসুস দাবি করেন, চলতি বছরে ২০২০ সালের থেকেও বেশি মারাত্মক আকার ধারণ করবে করোনা ভাইরাস। করোনা যে আরো বেশি মারাত্মক হতে চলছে, তার ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই তারা পেয়ে গেছে বলেও দাবি করে সংস্থাটি।

গত তিন দিন ধরে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা তিন হাজারের ঘর ছাড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যাও অর্ধশতকের ঘর পেরিয়ে এখন ৬০-এর ঘর অতিক্রম করেছে। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৯৫৬ জন। ২২ এপ্রিলের পর একদিনে এত সংখ্যক রোগী শনাক্ত হলো। ওই দিন ৪ হাজার ১৪ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ার কথা জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আর গত ৪ মে ৬১ জনের মৃত্যুর পর গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৬০ জন। আগের দিন মঙ্গলবার ৩ হাজার ৩১৯ জন রোগী শনাক্ত ও ৫০ জনের মৃত্যু হয়। আর সোমবার ৩ হাজার ৫০ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ে এবং মৃত্যু হয় ৫৪ জনের।

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনা সংক্রমণ শনাক্তের গড় হার ১৬ দশমিক ৬২ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সংক্রমণের হার ১২ দশমিক ৩২, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৩ দশমিক ৭৯, ময়মনসিংহে ১৩ দশমিক ৪৯, রাজশাহী বিভাগে ১৯ দশমিক ৭১, রংপুরে ৩০ দশমিক ১৭, খুলনায় ৪০ দশমিক ৩৭, বরিশালে ১২ দশমিক শূন্য ৫ এবং সিলেটে ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ। আগের দিন মঙ্গলবার ঢাকায় সংক্রমণের হার ছিল ৭ দশমিক ৫, চট্টগ্রামে ১৮ দশমিক শূন্য ৯, ময়মনসিংহে ১৩ দশমিক ৬৬, রাজশাহীতে ১৬ দশমিক ৬, রংপুরে ৩০ দশমিক ৮, খুলনায় ৪০ দশমিক ৮, বরিশালে ৮ দশমিক ৩ এবং সিলেট বিভাগে ১৭ দশমিক ১ শতাংশ। আর সোমবার ঢাকায় ৯, চট্টগ্রামে ১৭ দশমিক ৭৩, ময়মনসিংহে ১০ দশমিক ৬৩, রাজশাহীতে ১৯ দশমিক ১৩, রংপুরে ২৯ দশমিক শূন্য ১, খুলনায় ৩৮ দশমিক ৭১, বরিশালে ১১ দশমিক ৭৩, সিলেটে ১৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনা বুলেটিনে মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে যেসব এলাকায় করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে সেগুলো হলো- সাতক্ষীরা, নড়াইল, যশোর, খুলনা, নাটোর, কুড়িগ্রাম, নওগাঁ, দিনাজপুর, চুয়াডাঙ্গা ও রাজশাহী। অবশ্য রাজশাহীতে সংক্রমণ খানিকটা কমতির দিকে আর রংপুর ও খুলনায় ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির অন্যতম সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, ঈদের পর থেকেই সীমান্তবর্তী এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে। তবে এই সংক্রমণ এখন সীমান্তবর্তী এলাকা ছেড়ে এখন অনান্য জেলাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি সেখানে কঠোর লকডাউন কার্যকর করতে হবে। লকডাউন মানে ওই এলাকার মানুষ পুরোপুরি ঘরবন্দি। রোগী শনাক্ত, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন যদি নিশ্চিত করতে পারি তাহলে ওই এলাকার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। আর যদি তাতে ব্যর্থ হই তাহলে ওই সব এলাকায় সংক্রমণ তো বাড়বেই, পাশাপাশি বাড়বে মৃত্যুও। সেইসঙ্গে ওই সংক্রমণের ঢেউ ছড়িয়ে পড়বে দেশের সর্বত্র। কুরবানি ঈদের সময়ও যদি গাদাগাদি করে মানুষের চলাচল ও যাতায়াত অব্যাহত থাকে তাহলে করোনা থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, করোনা সংক্রমণ বাড়ার দিকেই আছে। এখন সংক্রমণ শুধু ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই, সারাদেশেই বাড়ছে। সারাদেশে যে বাড়ছে তা ঈদের পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে এবং সীমান্ত এলাকায় বাড়ছে ঈদ-পরবর্তী সীমান্ত এলাকা ও আমকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যের কারণে। বিশেষ করে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁতে বাড়ছে আমকেন্দ্রিক বাণিজ্যের কারণে। সংক্রমণ এখন দিন দিন বাড়বে। আশঙ্কা প্রকাশ করে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, কুরবানির ঈদে হাটসহ ঈদকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে যাবে। তখন ঝুঁকি আরো বাড়বে।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, দেশের করোনা সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ঊর্ধ্বমুখী জেলাগুলোর পর শিগগিরই ঢাকায় বড় আঘাত আসবে, যা হবে খুবই ভয়ের ব্যাপার। তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে সংক্রমণ আরো বাড়বে। যে কোনো সময় করোনার সার্বিক পরিস্থিতি আমাদের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। তখন আমরা হয়তো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারব না।

এমআই



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *